তথ্য বিভ্রাট

অর্থনীতির সংকটগুলো প্রকট ও দীর্ঘায়িত হয়েছে

জাতীয় অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ ও কার্যকর নীতি প্রণয়নে প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান। কিন্তু দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অবস্থান নিয়ে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। বাস্তবতার

জাতীয় অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ ও কার্যকর নীতি প্রণয়নে প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান। কিন্তু দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অবস্থান নিয়ে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। বাস্তবতার সঙ্গে কদাচিৎ মিল পাওয়া যায় পরিসংখ্যানগুলোর। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে রফতানি বাণিজ্য, রিজার্ভ, রাজস্ব আহরণ ইত্যাদি সব বিষয়ের তথ্যে নানা ধরনের অসংগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর। বলা বাহুল্য, এ কারণে অর্থনীতির সংকটগুলো প্রকট ও দীর্ঘায়িত হয়েছে। কেননা সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া কার্যকর নীতি প্রণয়ন সর্বদাই ব্যাহত হয়। সম্প্রতি দেশের একজন উপদেষ্টাও এ বিষয়ে এক অনুষ্ঠানে আলোকপাত করেছেন। তার ভাষ্যমতে, সঠিক তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কোনো কিছুর সঠিক মূল্যায়ন হয় না।

এদিকে বিগত সরকারের শাসনামলে তৈরি প্রায় সব পরিসংখ্যান নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রাট রয়েছে। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এনে বানোয়াট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। এ সরকার পরিবর্তনের পর অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও করণীয় জানতে বর্তমান সরকার শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল। সম্প্রতি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদনে গত ১৬ বছরের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে অতিরঞ্জিত এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে। বিশেষ করে ২০১০-১৯ সময়কালের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে বলে সে কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে। এ প্রতিবেদনে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তথ্য কারসাজির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। এ কমিটির মতে, সরকারি পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনায় পদ্ধতিগত পক্ষপাত ছিল। দুঃসময়েও প্রবৃদ্ধির হার অত্যধিক দেখানো হয়েছে, যা বাস্তব অর্থনীতির সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি বিভিন্ন সময় সরকারের প্রকাশিত তথ্যে আপত্তি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক প্যানেল ডাটাও ইঙ্গিত দিয়েছে যে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি সরকারি হিসাবের চেয়ে কম ছিল।

এ ধরনের বিকৃত পরিসংখ্যানের কারণে দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলেও। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিসংখ্যানকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলায় বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে সামষ্টিক অর্থনীতি। এসব ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণের কারণেই ধাক্কা লেগেছে দেশের অর্থনীতিতে।

এখন এ ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সঠিক পরিসংখ্যান অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিবিএস দেশের সব ধরনের সরকারি পরিসংখ্যান তৈরি ও প্রকাশ করে। বিবিএসের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠানটিতে বানোয়াট পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না, কেউ ন্যূনতম আপত্তি তুললে তাকে বদলি করে দেয়া হতো। এমনকি বিনা কারণে বিভাগীয় মামলা দিয়ে হয়রানিও করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর এ ধরনের বিষয়টিতে পুরোপুরি পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে কার্যকর নীতি প্রণয়নে সরকারের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। নয়তো ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারেই আস্থাহীনতার সংকট আরো তীব্র হবে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্বাসযোগ্য না হলে তা সঠিক নীতি গ্রহণ ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।

বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরির শুরুটা হতে পারে বিবিএসের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে। কেননা এটি জাতীয় পরিসংখ্যান প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকের অবস্থান প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র (বিআইডিএস) পরিচালিত এক জরিপ থেকে জানা যায় যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যবহারকারী বিবিএসের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস মূল্যস্ফীতি পরিসংখ্যান নিয়ে। এ অবস্থায় সামষ্টিক অর্থনীতির সঠিক পরিসংখ্যান তৈরিতে বিবিএসের কাঠামোগত সংস্কার আবশ্যক।

বিশ্লেষকদের মতে, সংস্থাটির পরিসংখ্যান প্রকাশে দক্ষতা ও পেশাদারত্বের অভাব রয়েছে। সুতরাং এখানে পেশায় দক্ষ লোক নিয়োগ করতে হবে। পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এখানে দক্ষ পরিসংখ্যানবিদদের আনতে হবে, যারা পরিসংখ্যান প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করবে এবং প্রয়োজনীয় ইনপুট দেবে। এছাড়া কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো খতিয়ে দেখতে হবে এবং স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও বিবিএসের পরিসংখ্যান যাচাই-বাছাই করা উচিত। মোট কথা, এক্ষেত্রে বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হবে।

আবার অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে কমবেশি ফারাক সবসময়ই থাকে এবং এর কারণ হলো পদ্ধতিগত। কিন্তু পদ্ধতিগত কারণে পার্থক্য খুব বেশি হওয়ার কথা না। যদি পার্থক্য খুব বেশি হয় তাহলে সেটি উদ্বেগের বিষয়। যেকোনো বিষয়ে তাই একক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা উচিত কিংবা ‘প্রকৃত’ পরিসংখ্যান যেকোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ করা উচিত।

এছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ যেহেতু বিদেশী বিনিয়োগ, তাই আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা ফেরাতেও উদ্যোগ নিতে হবে। এর জন্য বিশ্বব্যাংকের ২৫টি সূচক বিবেচনায় তৈরি হওয়া স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। ২০১৪ সালে এ সূচকে দেশের সার্বিক স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে ৮০। আর মেথডোলজি বা পদ্ধতিগত সূচক ছিল ৭০। এর পর থেকেই দুটি স্কোরই কমতে থাকে। ২০২০ সালে পদ্ধতিগত স্কোর অর্ধেকের বেশি কমে ৩০-এ নেমে আসে। বহির্বিশ্বে দেশের পরিসংখ্যান নিয়ে আস্থা ফেরাতে হলে বিশ্বব্যাংকের এ ইন্ডিকেটরের স্কোর বাড়ানোর কাজ করাটা জরুরি।

সর্বোপরি প্রয়োজন পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তির সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের শাস্তির আওতায় আনা। পাশাপাশি যাদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে তাদের ন্যায্যতা প্রাপ্তিও নিশ্চিত করতে হবে। সব ধরনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে, এমন সময়োচিত ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান আমাদের প্রয়োজন, যার মাধ্যমে শ্লথ হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা গতি ফিরে পাবে।

আরও